জনপ্রিয় ট্যাগস

Sunday, January 2, 2022

ঈশ্বর এমন কোনো পাথর তৈরি করতে পারেন কিনা যা তিনি নিজেই উত্তোলন করতে অক্ষম? রিপন সরকার

অমনিপটেন্ট প্যারাডক্স

নিয়ে অবিশ্বাসীদের একটা ব্যাতিক্রম ধরণের প্রশ্ন সবাই শুনেছেন বা পড়েছেন, যার কারনে অনেকেই সংশয় এ ভোগেন। এই অমনিপটেন্ট প্যারাডক্সে এর মূল কথা হচ্ছে,
ঈশ্বর এমন কোনো পাথর তৈরি করতে পারেন কিনা যা তিনি নিজেই উত্তোলন করতে অক্ষম?


এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি হ্যাঁ/না যা-ই বলেন না কেন, উভয়ক্ষেত্রেই তা ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান হওয়ার দাবিকে খণ্ডন করে। কিন্তু এটাকে আমরা কিভাবে ডিফেন্ড করতে পারি কখনো ভেবেছেন? কিঞ্চিৎ আলোচনা হোক, এই যুক্তিটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা আমরা পরখ করে দেখি।

ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হয়ে থাকেন তাহলে তিনি এমন কোনো ভারী পাথর তৈরি করতে পারেন কিনা যা তিনি নিজেই বহন করতে অক্ষম? - এইটা আসলেই একটা Loaded Question কারন খুনির ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তুমি কেন খুন করেছ, বলো'। এই প্রশ্নের উত্তরে সে যাই উত্তর দিক না কেন, সে খুনিই সাব্যস্ত হবে। অথবা, প্রশ্নটা যদি এভাবে হয়ঃ তুমি কি খুন করেছো? এই প্রশ্নের উত্তরের অপশন হিসেবে ১/ হ্যাঁ, ২/ অবশ্যই যদি এই দ্যটি অপশন বাছাই করতে বলা হয় তাহলে কী দাঁড়ায়? যেকোনো একটা অপশন বাছাই করলে তো সে খুনিই সাব্যস্ত হবে।

আসলে এ ধরণের প্রশ্নই এক একটা ট্র‍্যাপ, প্রশ্নকর্তা উত্তর গ্রহণ করার কোনো স্কোপ রাখেনা কারণ তিনি তার পছন্দমত উত্তরই খুঁজতে চান যেটাকে কুযুক্তি বলা চলে। আবার অন্যদিকে নাস্তিকরা নিজেদের মুক্তমনা দাবি করে, তাদের যদি অনুরুপ একটা প্রশ্ন করি যে নাস্তিকরা তো ব্যাক্তি স্বাধীনতায় আস্থা রাখে তার মানে তারা নারীদেরকে ধর্ষণ করতে পারে? তারা নিশ্চই উত্তর দেবে "না"
তারপর আবার যদি উলটো প্রশ্ন করা হয়, তাহলে এটি ব্যাক্তি স্বাধীনতা কীভাবে হয়?
এই প্রশ্নের মিমাংসা করার জন্য সে ব্যাক্তি স্বাধীনতার সংজ্ঞায় যাবে, ব্যাক্তি স্বাধীনতা আসলে কী সে বুঝাবে!
ব্যাক্তি স্বাধীনতার ও একটা সংজ্ঞা আছে যেটা আমি জানিনা বিদায় এরকম আজগুবি প্রশ্ন আমার মাথায় উদয় হতে পারে। তাই কেও যদি সর্বশক্তিমান এর সংজ্ঞা না জেনে একটা অযাচিত প্রশ্ন করে বসে সেই প্রশ্নে আবার উত্তর দেওয়ার স্কোপ ও না রাখে সেটা অবশ্য রিডিকিউলস।

ঈশ্বর প্রসঙ্গে প্রশ্নটা এমন হওয়া উচিত, যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হয় তাহলে কি তিনি সমস্তকিছু করার সামর্থ্য রাখেন/করেন?
সর্বশক্তিমান এর অর্থ এই নয় যে তিনি যা ইচ্ছা তা করেন। যদি সর্বশক্তিমান এর সংজ্ঞা এটাই হয় যে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন তাহলে এমন প্রশ্ন আসবে যে তিনি চুরিও করতে পারেন? ডাকাতিও করতে পারেন? ঘুষ ও নিতে পারেন? কারন যিনি সর্বশক্তিমান তিনি সবকিছুই করতে পারেন।

এর উত্তর খুব স্পষ্ট যে বৈদিক শাস্ত্রে ঈশ্বরের কার্য সম্পর্কে উল্লেখিত হয়েছে আর তা হলোঃ
১/ মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা, প্রকৃতির আইন তৈরী করা, এবং সময় এলে তা ধংস করা।
২/ জীবের কৃতকর্মের যথাযথ ফল এর বিধান করা।
৩/ প্রত্যেক সৃষ্টিকল্পে সমস্ত মানবজাতির উদ্দেশ্যে সত্য জ্ঞান(বেদ) প্রদান করা।
উপরে উল্লেখিত এই সমস্ত কাজে ঈশ্বরকে কেও বাঁধা প্রদান করার সামর্থ্য রাখে না এবং সে সমস্ত কাজে তার সাহায্যের ও প্রয়োজন হয়না তাই তিনি সর্বশক্তিমান। এটাই সর্বশক্তিমান এর সংজ্ঞা হওয়া উচিত।

এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আরেকটি প্রশ্ন জন্ম হতে পারে, 'তাহলে কী সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ও কোনো নিয়ম এর মধ্যে আবদ্ধ? যিনি তার কার্যে স্বাধীন নয় তিনি কি করে সর্বশক্তিমান হতে পারে?'
ধরুন আপনি একজন একনায়কতন্ত্রিক দেশের প্রধান
মন্ত্রী, সেই দেশের সর্বক্ষমতাময় ব্যাক্তি আপনি, আপনার নির্দেশ ছাড়া সেখানে কিছুই হয়না। আপনি ইচ্ছা করলেই যেকারও টাকা লুটপাট করতে পারেন, তাদের উপর নির্যাতন করতে পারেন কিন্তু ক্ষমতা থাকার সত্বেও আপনি তা করেন না কারন আপনি একজন ভালো মানুষ অন্যথায় আপনাকে সবাই অমানুষ বলে চিনবে, আপনি ভাল মানুষ বিদায় আপনি মানুষের মানবিক কার্যাবলীর নিয়ম ভঙ্গ করে কারও সাথে ইচ্ছা করেই নির্যাতন করেন না। তার মানে এই নয় যে এইটা আপনার অক্ষমতা। আপনি এখানে আপনার মানুষ হওয়ার নিমিত্তে ভাল মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।

একই উদাহরণ ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও ঘটে। ঈশ্বরকে কেবল 'সর্বশক্তিমান' এই অক্ষর এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না সেইসাথে তিনি করুণাময়, দয়ালু, মহৎ এরুপ অসংখ্য গুণাবলিও তার মধ্যে বিদ্যমান আছে। তিনি সর্বশক্তিমান তাই তিনি চুরি করবেন ডাকাতি করবেন তাহলে তিনি ঈশ্বর বলে প্রসিদ্ধ না হয়ে, হবেন দৈত্য।
তিনি সমস্তকিছুই একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চালনা করেন, সেই নিয়ম তিনি ভঙ্গ করেন না। এইটা তার অক্ষমতা নয়, তিনি যে ঈশ্বর সেটি তার ঈশ্বরত্বের পরিচয়।

তাছাড়া বৈদিক ঈশ্বর এর সংজ্ঞা আব্রাহামিক মত অনুযায়ী নয় যে তিনি আকাশ এর উপরে কোনো এক কাল্পনিক সিংহাসন এর উপর অধিষ্ঠিত হয়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে বাস করছেন আর সেখান থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। অমনিপটেন্ট প্যারাডক্স এর এমন প্রশ্ন শুধুমাত্র তখনই করা সম্ভব যখন কেও ঈশ্বরকে নির্দিষ্ট রুপ বা আকৃতিতে সীমাবদ্ধ করে দেয়।
বৈদিক ঈশ্বর সর্বব্যাপী হিসেবে খ্যাত, ব্রহ্মাণ্ডের এমন কোনো স্থান শুণ্য নেই যেখানে তিনি নেই, সর্বব্যাপী হয়েই তিনি সবকিছু ধারণ করেন, তাই তাকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান এ সীমাবদ্ধ করা যায়না। ব্রহ্মাণ্ডে এমন কিছুই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয় যেখানে তিনি বিরাজমান নয়। কাজেই অমনিপটেন্ট প্যারাডক্স এখানেই খন্ডন হয়।


সূত্রঃ Noren Kanti Nath

Print Friendly and PDF

No comments:

Post a Comment