লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ,
উপরের এই তথ্যসহ লক্ষ্মীপূজা সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে আমার এক পোস্টে কমেন্ট করেছে Reya Chowdhury নামের এক ভদ্র মহিলা; শুধু তার নয়, সব হিন্দুর মনের ক্ষুধা মেটাতে এই পোস্টে দিলাম
লক্ষ্মী পূজার ইতিবৃত্ত :
তার কমেন্টটি ছিল ইংলিশ ফন্টে বাংলায় লেখা, অনেকেরই এধরনের লেখা পড়তে সমস্যা হয়, সেজন্য সেটাকে আমি আপনাদের সুবিধার জন্য বাংলা ফন্টে বাংলায় লিখেছি, আগে সেটা দেখে নিন নিচে, তারপর জেনে নিবেন আমার উত্তর। তার কমেন্টটি হলো-
Reya Chowdhury আমি একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই। লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ আর নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়। আমি জানতে চাই দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে ? আর লক্ষ্মী ই যুগে যুগে সীতা এমনকি রাধা হয়ে জন্ম নিয়েছে এবং রাধা-কৃষ্ণের পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়, এটা কিভাবে সম্ভব ? লক্ষ্মীর কাছে ঘন্টা বাজালে নাকি লক্ষ্মী শ্রী স্তব্ধ হয়ে যায়, ঘন্টার শব্দে লক্ষ্মী নাকি পাথর হয়ে যায়, তাই সব শ্রী পাথর হয়ে যায়। আমাদের বাসায় এক সা সাথে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, রাধা-কৃষ্ণ, গোপাল এবং শিব ঠাকুর বসানো আছে; তাহলে আমাকে কিভাবে পূজা করতে হবে ? (ইংলিশ ফন্টে লিখা মূল কমেন্টটি পাবেন পোস্টের শেষে।)
ধর্ম সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের জবাবে হিন্দুদের কমন এবং একটাই উত্তর, জানি না, বাপ-দাদারা করে আসছে তাই আমরাও করি। কিন্তু এটা কোনো উত্তর নয়, এটা পালিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে বাঁচা। প্রশ্ন হলো আক্রমন, তাই এই আক্রমন থেকে বেশি দিন পালিয়ে থাকা বা বাঁচা যায় না, আক্রমনকারীকে হয় জবাব দিতে হয়, না হয় তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। ধর্মসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব যদি আপনি দিতে পারেন, আপনার ধর্ম-সংষ্কৃতি টিকে যাবে, আর যদি দিতে না পারেন প্রশ্নকারীর ধর্মে আপনি বা আপনার বংশধরদের ধর্মান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে আপনার পৈতৃক ধর্ম-সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যাবে । এজন্য ধর্মীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে যা ই করি তার প্রতিটি জিনিসের ব্যাখ্যা জানা প্রতিটি হিন্দুর জন্য খুবই জরুরী।
দুর্গা পূজার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পূজা হচ্ছে সরস্বতী পূজা। এই পূজাটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয় বলে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজও পায়। সাংবাদিকদের কাজই হচ্ছে প্রশ্ন করা, তাই পূজা কভার করতে গিয়ে তারা কোনো না কোনো হিন্দুকে এই প্রশ্ন করবেই যে এই পূজা কেনো করা হয় বা এই জাতীয় কিছু একটা। প্রশ্নটা যদি কোনো জানাশুনা হিন্দুর কাছে গিয়ে পড়ে তাহলে রক্ষা, আর না হলে সেই কমন উত্তর, জানি না, বাপ- ঠাকুর দাদারা করে আসছে তাই আমরাও করছি। আর এটা শুনেই মুসলমানরা প্ল্যান করে ফেলে হিন্দুদেরকে ব্রেইন ওয়াশ করে ধর্মান্তরিত করতে কোথায় কিভাবে হিট করতে হবে।
এই সরস্বতী পূজা এবং তার নানা অনুষঙ্গ নিয়ে আমার অন্য এক পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আজ যখন সুযোগ এসেই গেলো তখন লক্ষ্মীপূজার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো এই পোস্টে। দিদির প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি, দিদি প্রথমেই লিখেছে,
“লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ আর নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়। আমি জানতে চাই দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে?”
লক্ষ্মী পূজায় যে ঘন্টা বাজানো নিষেধ, এই তথ্যটা সম্ভবত ম্যাক্সিমাম হিন্দুই জানে না। জানবে কিভাবে, যাদের উপর আমরা পূজার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছি, তাদের মূল কাজই তো হলো- নমো নমো ব’লে ফুল জল ছিটিয়ে চাল কলা আর দক্ষিণা নিয়ে বিদায় হওয়া। হিন্দুধর্মের তত্ত্ব হিন্দুদের শিখিয়ে তারা নিজেদের ভাত মারবে নাকি !
লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানোর সাথে সাথে লোহা বা স্টিলের কোনো কিছু ব্যবহার করাও নিষেধ। লোহা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে শাস্ত্রে বলা আছে, লোহা দিয়ে নাকি অলক্ষ্মীর পূজা হয়, তাই লোহা দিয়ে লক্ষ্মীর পূজা হয় না। পূজায় যে ঘন্টা বাজানো হয়, সেই ঘন্টাও এক ধরণের লৌহজাত পদার্থ খেকেই তৈরি, এই দৃষ্টিকোন থেকে লক্ষ্মীপূজায় ঘন্টা না ব্যবহারের একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এই বিশ্বাসটা পুরোটাই আধ্যাত্মিক, এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যতক্ষণ না কর্মে প্রকাশ পাচ্ছে, ততক্ষণ এটা কারো বাস্তব জীবনে কোনো দিন প্রভাব ফেলে না আর ফেলবেও না। তাহলে লক্ষ্মী পূজা্য় এই লোহা, স্টিলের জিনিসপত্র বা ঘন্টা বাজাতে না বলার বাস্তব কারণ আসলে কী ?
আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান অর্থাৎ গবেষণায় যে জ্ঞান লাভ করতেন, তা তারা সমাজের মানুষের জন্য ধর্মের মোড়কে প্রচার করতেন। কারণ, তাহলে মানুষ খুব সহজে সেগুলো বিশ্বাস করতো, সেই অনুযায়ী কাজ করতো এবং বাস্তবে তার ফল লাভ করতো। যেমন তুলসীগাছ এবং তার পাতার গুণাগুন নিয়ে আমাদের মুনি-ঋষিদের যে গবেষণা তা যদি আমি লিখি, সেটা ৫/৬ হাজার শব্দের একটা পোস্ট হবে এবং আপনাদের পড়তে কমবেশি ১ ঘন্টা সময় লাগবে। কিন্তু এত কথা কি সাধারণ মানুষকে গিয়ে জনে জনে বলা সম্ভব ? সেজন্য তারা সর্বসাধারণের জন্য শুধু বলেছেন,
“যারা প্রত্যহ তুলসীর দর্শন, স্পর্শন, ধ্যান, গুণ কীর্তন, প্রণাম, গুণশ্রবন, রোপন, জল প্রদান ও পূজা এই নয় প্রকারে তুলসীর ভজনা করেন তারা সহস্র কোটি যুগ পর্যন্ত বিষ্ণুলোকে বসতি লাভ করেন”।
এখন এই বিষ্ণুলোকে বসতি লাভ করার ব্যাপারটা তো আধ্যাত্মিক, মরার পর সেখানে আপনার জায়গা হোক বা না হোক, বিষ্ণুলোক থাক বা থাক, তুলশী গাছ সম্পর্কিত ঐ নির্দেশ মেনে চললে আপনার পার্থিব জীবন যে, রোগ-শোক মুক্ত সুন্দর হবে, সেটা তো নিশ্চিত। আমাদের মুনি-ঋষিদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো এটাই, পৃথিবীর মানুষকে ভালো রাখা। এই ভালো রাখার একটি বাস্তব থিয়োরি লুকিয়ে আছে লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা না বাজানোর মধ্যে।
মানুষের চরিত্রের একটা স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো ঈর্ষা। এই ঈর্ষা হলো মানুষের মনের চাপা অনুভূতি যেটা কথার মাধ্যমে নয়, প্রকাশ পায় মানুষের মুখণ্ডলের অভিব্যক্তির মাধ্যমে। একটা সূক্ষ্ম এবং কঠিন বাস্তব কথা হলো- শিক্ষক এবং পিতা মাতা ছাড়া আপনার উন্নতি প্রকৃতপক্ষে কেউ ই চায় না। আপনার ছোটবেলায়, আপনার যে ভাই আপনার ভালো রেজাল্টের জন্য আপনাকে রাত দিন পড়িয়েছে, আপনি যখন বড় হয়ে সেই ভাইকে শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞানে ছাড়িয়ে যেতে চাইবেন বা ছাড়িয়ে যাবেন, সেই ভাই তখন আপনাকে নিয়ে ঈর্ষায় ভুগবে। আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে ভাই আপনাকে টাকা পয়সা দিয়ে হেল্প করে লাইনে তুলে দেবে, সেই ভাই ই আপনাকে নিয়ে ঈর্ষায় ভুগবে যখন আপনি টাকা পয়সা, ধন সম্পদে তাকে ছাড়িয়ে যাবেন। ছোট বেলায় যে ভাইয়েরা একে অপরের জন্য জীবন দেয়, বড় হওয়ার পর সংসার ভাগ হয়ে গেলে সেই ভাইয়েরাই বাঁশ ঝাড়ের একটা বাঁশ কাটা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে নিজের পরিবারের মধ্যেই কোনো ভাই যখন প্রকৃত অর্থে মন থেকে চায় না আপনার উন্নতি, তখন আপনার প্রতিবেশি সেটা চাইবে কিভাবে ? ঘন্টা বাজিয়ে প্রতিবেশিকে জানান দিয়ে ধন-সম্পদের জন্য লক্ষ্মীপূজা করলে আপনার প্রতিবেশি কি আপনার প্রতি ঈর্ষায় ভুগবে না ? এটাই তো বাস্তব, যখনই আপনি উন্নতির জন্য চেষ্টা করেন তখনই আপনার আশে পাশের লোকজন আপনার প্রতি ঈর্ষায় ভুগে এবং আপনাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করে। আর যখন তারা জানবে, উন্নতির জন্য আপনি লক্ষ্মীর পূজা করছেন, তখন তারা কী ভাববে ?
অনেকে হয়তো ভাবছেন, প্রকাশ্যেই তো লক্ষ্মীপূজা করা হয়, এতে আবার গোপনীয়তার কী ? প্রকাশ্যে যেটা করা হয় সেটা পাড়ার মন্দিরে সার্বজনীন অর্থাৎ সবার জন্য, সেখানে ঈর্ষার কোনো ব্যাপার থাকে না। কিন্তু বাড়িতে ঘরের মধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজা করার বিধান শাস্ত্রে দেওয়া আছে এবং ঘরের মধ্যেই লক্ষ্মী পূজা করার বিধান যাতে ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা থাকে, এখানে আমি সেই সিচুয়েশানকে বেজ করেই কথা বলছি, শাস্ত্রের বিধানও তাই- ঘরেই লক্ষ্মী পূজা করা। আর এট তো কমনসেন্সের ব্যাপার যে, ঘরে লক্ষ্মীকে ধরে রাখার জন্য ঘরের ভেতরই তার পূজা করা উচিত, মাঠের মধ্যে তার পূজা করে লাভ কী ? মাঠের মধ্যে প্যান্ডেল খাটিয়ে যে লক্ষ্মী পূজা করা হয় সেটা জাস্ট অনুষ্ঠান মাত্র, ঘরের মঙ্গল তাতে কখনো হয় না আর হবেও না।
তাই প্রতিবেশিদের ঈর্ষা থেকে বেঁচে নিজেদের উন্নতি করতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মী পূজা করতে হবে গোপনে, এজন্যই লক্ষ্মীপূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ; কারণ, ঘন্টার কাজই হলো কী ঘটছে তা সবাইকে জানার সুযোগ করে দেওয়া। আর একারণেই স্টিল বা লোহাজাত কোনো বাসন কোসন ব্যবহার করাও নিষেধ; কারণ এগুলো ধাতব পদার্থ বলে ব্যবহারের সময় ঠোকাঠুকি লেগে শব্দ হতে পারে, যা গোপনীয়তা নষ্ট করতে পারে। অন্য কোনো পূজার সাথে মানুষের ঈর্ষার কোনো প্র্যাকটিক্যাল যোগাযোগ না থাকায়, অন্যান্য সব পূজাতে ঘন্টা বাজানো যায়, এর মূল কারণ প্রতিবেশিদেরকে সেই বিষয়টি জানানো, যাতে সবাই সেই পূজায় অংশগ্রহনের মাধ্যমে নিজেদের মঙ্গল ও কল্যান কামনা করতে পারে।
এরপর দিদির প্রশ্ন হচ্ছে,
“দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে?”
ব্যাপারটা সিম্পল, আপনার ঘরে নিশ্চয় টিভি আছে। তো আপনি কি একই সময় দুইটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখতে পান ? নিশ্চয় নয়। একটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা বন্ধ করেই আপনাকে অন্য আর একটা চ্যানেলে যেতে হয়। প্রকৃতপক্ষে একটা মানুষ কখনোই দুটো কাজ এক সাথে করতে পারে না। তাকে যেকোনো একটা কাজ বন্ধ রেখে অন্য আর একটা কাজ করতে হয়। তাই আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যদি বিধিসম্মতভাবে লক্ষ্মীপূজা করেন ঠিক একই সময়ে নারায়ণের পূজা করেন না। যেমন একই সময় টিভিতে আপনি দুইটা চ্যানেল দেখতে পারেন না। আপনি যদি একই ফুল দিয়ে দুই দেবতাকে সন্তুষ্ট করার নিয়ম চালু করে থাকেন, সেটা অন্য ব্যাপার; কারণ, একই কথা বলে আপনি কখনো দুই জনকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, যদি আপনি তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে চান- যাকে যা বললে সন্তুষ্ট হবে, তাকে আপনাকে তাই বলতে হবে। তাই আপনাকে একটা পূজা শেষ করে অন্য আর একটা পূজা করতে হবে, এটাই সমাধান আর এটাই বাস্তবসম্মত।
মূর্তি যেহেতু একই মন্দিরে স্থাপিত সেহেতু আপনার মনে হতে পারে, নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজালে লক্ষ্মী তো শুনে ফেলবেই, তাহলে লাভ কী হলো ? পূজার ঘন্টা কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে বাজানো হয় না, হয় প্রতিবেশি বা আশে-পাশের লোকজনকে সেই পূজার বিষয়টি জানানোর জন্য; লক্ষ্মীপূজায় কেনো ঘন্টা বাজানো নিষেধ, তার বাস্তব কারণ উপরে আলোচনা করেছি, আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছেন। তাই ঘন্টা বাজানো নিয়ে এত দ্বিধায় ভোগার কোনো কারণ নেই। আপনি যদি আলাদা করে শুধু লক্ষ্মীপূজা করেন সেক্ষেত্রেই কেবল ঘন্টা বাজানো নিষেধ, যাতে আপনার প্রতি প্রতিবেশিদের ঈর্ষার সৃষ্টি না হয়।
আর জেনে রাখুন, লক্ষ্মী আলাদা কোনো দেবী সত্ত্বা নয়, লক্ষ্মী নারায়ণ বা বিষ্ণুরই নারী শক্তি, যাকে আমরা স্থূল দৃষ্টিতে নারায়ণ বা বিষ্ণুর স্ত্রী বলে থাকি। একইভাবে ব্রহ্মার নারী শক্তি সরস্বতী এবং মহেশ্বরের নারী শক্তি দুর্গা বা কালী। সংসারে নারীর গুরুত্ব বোঝাতে তিনটি প্রধান দেবতার সাথে তাদের নারী শক্তির কল্পনা করা হয়েছে। ব্রহ্মার কাজ সৃষ্টি করা, সৃষ্টি করতে লাগে জ্ঞান, এজন্য ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম সরস্বতী; শিবের কাজ ধ্বংস করা, এজন্য শিবের নারী শক্তি অসুর বিনাশী দুর্গা বা কালী; আর বিষ্ণুকে কল্পনা করা হয়েছে পালনকর্তা হিসেবে; পালন করতে লাগে ধন সম্পদ, এজন্য বিষ্ণুর নারী শক্তির প্রতীক হলো ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী। লক্ষ্মী যেমন আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, লক্ষ্মী ও বিষ্ণু এক, তেমনি বিষ্ণুও কোনো আলাদা সত্ত্বা নয়; বিষ্ণু, সৃষ্টিকর্তা পরমব্রহ্মেরই একটি রূপ, যার মাধ্যমে পরমব্রহ্ম তার সৃষ্টিকে পালন করে থাকে। সুতরাং লক্ষ্মী পুজা বা নারায়ণের পূজা বা যে দেবতারই পূজা করেন না কেনো, তা শেষ পর্যন্ত সেই পরম ব্রহ্মেরই পূজা এবং সকল পূজা তার কাছে গিয়েই পৌঁছা্য়, যেমন সকল নদীর জল সমুদ্রেই গিয়ে পড়ে।
আমার ধারণা দিদি তার সকল প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি শিরোনামেই জানিয়ে দিয়েছিলাম এই পোস্টে লক্ষ্মী পূজা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো, এখন শুরু করছি সেই আলোচনা :
লক্ষ্মীর কাঠামোতে বা লক্ষ্মীর ছবিতে পেঁচার সাথে সাথে আর যা কিছু থাকে, যেমন- কুলা, ধান সিঁদুরের কৌটাসহ সবকিছুই একটি সাজানো সুন্দর সংসারের প্রতীক, যাকে এককথায় বলে লক্ষ্মীর সংসার। এর মধ্যে ধান হলো ধনের প্রতীক। যাদের জমি-জমা আছে তাদের অবশ্যই ধান চাষ করা উচিত, এতে ধনের দেবী লক্ষ্মী, ঘরে বাঁধা থাকে ও সন্তুষ্ট থাকে। চাল কিনে খাওয়া দারিদ্রতার প্রতীক। যাদের চাষের জমি নেই, তারা চাল কিনে খেতে পারে, কিন্তু তারাও যদি ধান কিনে সেই ধান সিদ্ধ করে চাল বানিয়ে খায় তা মঙ্গলজনক; কারণ এতেও ধনের প্রতীক ধানের আগমন ঘটে বাড়িতে; আর এভাবে কুলার ব্যবহার কিছুটা হয়, কিন্তু সরাসরি চাল কিনে খেলে কুলার ব্যবহার তেমন হয় ই না, যার ফলে লক্ষ্মীর সংসার বলতে যা বোঝায় তা অপূর্ণই থাকে।
এখানে আর একটা বিষয় বলে রাখি, যেসব হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠানে কাউকে আশীর্বাদ করা হয়, খেয়াল করে দেখবেন, তাকে ধান দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। এর কারণ হলো- পূর্বেই বলেছি, ধান ধনের প্রতীক, তাই ধান মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করার মানে হলো- আমি প্রার্থনা বা কামনা করি তুমি ধনবতী বা ধনবান হও। আর দুর্বা হলো অমরত্বের প্রতীক। যেকোনো মাটিতেই দুর্বা জন্মে বা জন্মাতে পারে, এমন কি ১০০ বছর পরও যদি একবার কোনো নদী শুকিয়ে যায়, সেই নদীর তলাতেও দুর্বা ঘাস জন্মে থাকে। এভাবে দুর্বা অমর, কারণ তার কোনো মরণ নেই। ধানের সাথে দুর্বা দিয়ে এই প্রার্থনা বা কামনা করা হয় যে তুমি ধনবতী বা ধনবান হওয়ার সাথে সাথে অমরও হও।
লক্ষ্মীর সাথে আর যা পূজিত হয়, সেটা হলো পেঁচা। পেঁচা কয়েক প্রকারের থাকলেও লক্ষ্মীর সাথে থাকে বলে এক জাতের পেঁচার নামই লক্ষ্মী পেঁচা। এই পেঁচা হলো নিশাচর প্রাণী, এর মানে হলো পেঁচা দিনের বেলা বের হয় না, তাই পেঁচাকে সাধারণত দিনের বেলা দেখা যায় না, পেঁচা তার বাসা থেকে বের হয় রাতে, শিকার করেও রাতে। এভাবে পেঁচা একটা গোপন জাতের প্রাণী বা অন্যভাবে বলা যায় পেঁচা হলো গোপনীয়তার প্রতীক। তাহলে লক্ষ্মীর সাথে পেঁচার সম্পর্কটা কী ?
ধনার্জনের জন্য লক্ষ্মীর পূজা করতে হবে যেমন গোপনে, তেমনি লক্ষ্মীর সাথে পেঁচা থাকার মানে হলো অর্জিত সেই ধনসম্পদ রাখতেও হবে গোপনে। কারণ সম্পদের প্রকাশ পেলেই শত্রু বাড়ে, আর শত্রু বাড়লেই যে বিপদ সেটা তো সবাই বোঝেন। এজন্যই প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছে- অর্থই অনর্থের মূল। কারণ, অর্থ উপার্জনের পর সেই অর্থকে যদি আপনি ঠিক মতো ব্যবহার করতে না পারেন, তা আপনার বা আপনার পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে আনবেই আনবে।
পেঁচার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, পেঁচা রাতের বেলা কঠিন অন্ধকারকে ভেদ করেও দেখতে পায়। এখানে অন্ধকার হলো বিপদ-আপদের প্রতীক। আপনার যদি পর্যাপ্ত ধন-সম্পদ থাকে, আপনার সামনে যতই বিপদ-আপদ আসুক না কেনো, আপনি একটা রাস্তা খুঁজে পাবেনই। লক্ষ্মীর সাথে পেঁচা অবস্থান করে আমাদেরকে আসলে এই কথাগুলোই বলে। এভাবে লক্ষ্মীর সাথে যা যা থাকে বা আমরা যেসবের পূজা করি, সবই কিছুই, কিছু না কিছুর প্রতীক, আর সেই প্রত্যেকটা প্রতীক আমাদেরকে কিছু না কিছু তথ্য দেয়।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হিন্দু ছাড়া আর কেউ তো লক্ষ্মীপূজা করে না, তাহলে তারা কি ধন সম্পদ অর্জন করে না বা তাদের মধ্যে কি কেউ ধনী নেই ? সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো- বিলগেটস কি লক্ষ্মীপূজা করে ? তাহলে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী হলো কিভাবে ?
শুধু লক্ষ্মী পূজাই নয়, সমস্ত পূজাই প্রতীকী পূজা। এই প্রতীকগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য গল্প। এই প্রতীকগুলো আমাদেরকে কিছু বলে, আমাদেরকে কিছু তথ্য দেয়, যেকথাটা একটু আগেই বলেছি।
বাংলাদেশে, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, ১৬ ডিসেম্বর এবং ২৬ মার্চেও জাতীয় স্মৃতিসৌধেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়, ভারতসহ অনেক দেশেই এমনটা করা হয়, এটা আসলে একপ্রকার পূজা। কিন্তু এই ফুল পেয়ে, যারা মরে গেছে, তাদের কি কোনো উপকার হয় ? এক কথায়, না। তারপরেও কেনো আমরা প্রতিবছর ঐসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করি ?
আসলে এই সব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু তথ্য নতুন প্রজন্মের স্মৃতিতে ট্রান্সফার করা হয়, আর তাদের মধ্যে সেই সকল ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা হয়, যারা দেশ ও জাতির জন্য কিছু করেছে ? এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ একটি পরম্পরা তৈরি করে, যা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। কারণ, এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ মানুষের মস্তিষ্ক্যে এমন একটি প্রভাব ফেলে যা তাকে ঐ পরম্পরাটি বয়ে নিয়ে যেতে সাহা্য্য করে।
আমরা শ্রদ্ধাভরে যখন কোনো দেব-দেবীর পূজা করি, তখন আমাদের ব্রেইন এর মধ্যে ঠিক এমনই একটি প্রভাব কাজ করে, যে প্রভাবটি ঐ পূজা ব্যতীত কিছুতেই সৃষ্টি হতো না। ব্রেইন এর মধ্যে এই যে প্রভাব, সেটি আসলে কিভাবে আমাদেরকে সাহা্য্য করে ?
কোয়ান্টাম মেথডের সূত্রানূসারে যখন আমরা কোনো কিছু মনে প্রাণে চাই এবং বার বার চাই, তখন ব্রেইন সেটা আমাদেরকে পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে সেভাবে পরিচালিত করা শুরু করে, এভাবে ব্রেইন অবচেতনভাবে কাজ করেই আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কাছে পৌঁছে দেয়। এজন্যই আমরা যেটা বার বার ভাবি বা করতে চাই, খুব অসম্ভব কিছু না হলে সেটা আমরা পেয়েই যাই । আমাদের সকল পূজা প্রতীকী হলেও, পূজার মাধ্যমে আমাদের ঐকান্তিক চাওয়া, আমাদের ব্রেইন আসলে সেভাবেই পূরণ করে দেয়। কারণ, দেবতার কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা মূলত আমাদের মস্তিষ্ক্যে সেই বিষয়টি লোড করে দিই বা , মস্তিষ্ক্যকে সেই নির্দেশনা দিই, আর আমাদের মস্তিষ্ক্য আমাদেরকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করতে থাকে এবং এভাবেই আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাই।
এটা শুধু হিন্দুদের পূজা প্রার্থনার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো ধর্মের লোক তাদের সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলেও তার ব্রেইন এর মাধ্যমে সে একই ফল পায় বা পাবে। তো যে ছেলে বা মেয়েটা সরস্বতীর কাছে সরল বিশ্বাসে এই প্রার্থনা করছে যে, আমাকে জ্ঞান দাও, বুদ্ধি দাও; এই চাওয়ার ফলে সরস্বতীর উছিলায় তার ব্রেইন তাকে এমনভাবে পরিচালিত করছে, যার ফলে তার বাড়তি কিছু জ্ঞান বুদ্ধি লাভ হবেই। কারণ, যে বিদ্যালাভের জন্য প্রার্থনা করবে, সে বই নিয়ে দু চারদিন বেশি বা দুই চার ঘন্টা বেশি পড়বেই, সরস্বতীর উছিলায় কাজ হয় বা হবে এভাবেই; একইভাবে যে লোক, ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করছে, লক্ষ্মীর উছিলায় তার ব্রেইনও সেই লোককে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়াচ্ছে যাতে তার ভালো রোজগার হতে বাধ্য। কোনো অলৌকিক দেব-দেবী বা কোনো অলৌকিক সৃষ্টিকর্তা আসলে কারো জন্য কিছু করতে পারে না বা কাউকে কিছু দিতে পারে না। মানুষ তাদের বিশ্বাসের দেব-দেবী বা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে মূলত তাদের নিজেদের ব্রেইনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় বা তাদের চিন্তার ফলই তাদেরকে ফল দেয়।
পৃথিবীর সবাই চায় ধন-সম্পদ এবং এর জন্য তারা তাদের নিজ নিজ যোগ্যতার পাশাপাশি কামনা করে বেশি বেশি সম্পদ, কোনো অলৌকিক সত্ত্বার কাছে প্রার্থনা না করলেও তাদের মনের এই কামনাই তাদেরকে পৌঁছে দেয় তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, আর এভাবেই লক্ষ্মীপূজা না করেও যে যার মতো পায় ধন সম্পদ।
এখন বিজ্ঞানের এইসব নিগূঢ় তথ্য সবার পক্ষে জানা সম্ভব হয় না আর সাধারণ সব লোকের পক্ষে এটা বোঝাও সম্ভব নয়। যারা এই বিজ্ঞান জানে বা বোঝে, তারা লক্ষ্মী সরস্বতীর পূজা না করেও নিজেদের ব্রেইনকে কমান্ড করে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে বিজ্ঞানের এই জ্ঞান পৌঁছে নি বা যাদের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়, তারা সরল বিশ্বাসে জ্ঞান বুদ্ধির জন্য যদি সরস্বতীর কাছে এবং ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করে, একই ফল লাভ করবে। তবে এখানে একটা বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য যে, যে কোনো দেব-দেবীর কাছে পূজার নামে প্রার্থনা করতে হবে আপনার নিজেকে এবং এ্ই প্রার্থনা করতে হবে অবশ্যই মাতৃভাষায়। পুরোহিতকে দিয়ে যদি বাড়িতে পূজা করিয়ে নেন, আর আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি সেই দেব-দেবীর কাছে কোনো প্রার্থনা না করেন, তাহলে সেই পূজা পুরোটাই বেকার, শুধুই অর্থ খরচ। এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, যেকোনো পূজার জন্য আমরা যতসব আয়োজন করি, সেটা ঐ পূজাটাকে একটা অনুষ্ঠানে রূপ দিতে সাহা্য্য করে মাত্র; ফুল জল বেল পাতা ঐ দেব-দেবীর প্রতি আত্মসমর্পনের একটা প্রসেস; কারণ, একমাত্র আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিই পারে অহংকারমুক্ত হয়ে প্রকৃত অর্থে প্রার্থনা বা কামনা জানাতে। এ কারণে আমরা যদি কোনো পূজার আয়োজন না করেও শুধু দেব-দেবীর মূর্তি বা তাদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে প্রতিদিন প্রার্থনা করি, পূজার মতো একই ফল লাভ হবে, যে পদ্ধতিতে প্রার্থনা করে- ইসলাম, খ্রিষ্ট এবং ইহুদি মতাবলম্বীরা।
লক্ষ্মীপূজা সম্পর্কে শেষ প্রশ্ন হতে পারে, কোজাগরী মানে কী বা এটাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা কেনো বলা হয় ?
শরৎকালে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার রাত্রি বৎসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত্রি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতে ধনসম্পদ, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন; সেই রাতে যে বা যারা লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকে দেবী তার কাছ থেকে সাড়া পান এবং তার গৃহে প্রবেশ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন। কোজাগর আক্ষরিক অর্থ “কে জেগে আছ ?” এর থেকে এসেছে কোজগরী শব্দটি। এজন্য আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথির অন্য নাম হয়ে গেছে কোজাগরী পূর্ণিমা এবং ঐ তিথিতে অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপূজাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা বলে অভিহিত করা হয়।
সংগৃহীত
উপরের এই তথ্যসহ লক্ষ্মীপূজা সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে আমার এক পোস্টে কমেন্ট করেছে Reya Chowdhury নামের এক ভদ্র মহিলা; শুধু তার নয়, সব হিন্দুর মনের ক্ষুধা মেটাতে এই পোস্টে দিলাম
তার কমেন্টটি ছিল ইংলিশ ফন্টে বাংলায় লেখা, অনেকেরই এধরনের লেখা পড়তে সমস্যা হয়, সেজন্য সেটাকে আমি আপনাদের সুবিধার জন্য বাংলা ফন্টে বাংলায় লিখেছি, আগে সেটা দেখে নিন নিচে, তারপর জেনে নিবেন আমার উত্তর। তার কমেন্টটি হলো-
Reya Chowdhury আমি একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই। লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ আর নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়। আমি জানতে চাই দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে ? আর লক্ষ্মী ই যুগে যুগে সীতা এমনকি রাধা হয়ে জন্ম নিয়েছে এবং রাধা-কৃষ্ণের পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়, এটা কিভাবে সম্ভব ? লক্ষ্মীর কাছে ঘন্টা বাজালে নাকি লক্ষ্মী শ্রী স্তব্ধ হয়ে যায়, ঘন্টার শব্দে লক্ষ্মী নাকি পাথর হয়ে যায়, তাই সব শ্রী পাথর হয়ে যায়। আমাদের বাসায় এক সা সাথে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, রাধা-কৃষ্ণ, গোপাল এবং শিব ঠাকুর বসানো আছে; তাহলে আমাকে কিভাবে পূজা করতে হবে ? (ইংলিশ ফন্টে লিখা মূল কমেন্টটি পাবেন পোস্টের শেষে।)
ধর্ম সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের জবাবে হিন্দুদের কমন এবং একটাই উত্তর, জানি না, বাপ-দাদারা করে আসছে তাই আমরাও করি। কিন্তু এটা কোনো উত্তর নয়, এটা পালিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে বাঁচা। প্রশ্ন হলো আক্রমন, তাই এই আক্রমন থেকে বেশি দিন পালিয়ে থাকা বা বাঁচা যায় না, আক্রমনকারীকে হয় জবাব দিতে হয়, না হয় তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। ধর্মসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব যদি আপনি দিতে পারেন, আপনার ধর্ম-সংষ্কৃতি টিকে যাবে, আর যদি দিতে না পারেন প্রশ্নকারীর ধর্মে আপনি বা আপনার বংশধরদের ধর্মান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে আপনার পৈতৃক ধর্ম-সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যাবে । এজন্য ধর্মীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে যা ই করি তার প্রতিটি জিনিসের ব্যাখ্যা জানা প্রতিটি হিন্দুর জন্য খুবই জরুরী।
দুর্গা পূজার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পূজা হচ্ছে সরস্বতী পূজা। এই পূজাটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয় বলে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজও পায়। সাংবাদিকদের কাজই হচ্ছে প্রশ্ন করা, তাই পূজা কভার করতে গিয়ে তারা কোনো না কোনো হিন্দুকে এই প্রশ্ন করবেই যে এই পূজা কেনো করা হয় বা এই জাতীয় কিছু একটা। প্রশ্নটা যদি কোনো জানাশুনা হিন্দুর কাছে গিয়ে পড়ে তাহলে রক্ষা, আর না হলে সেই কমন উত্তর, জানি না, বাপ- ঠাকুর দাদারা করে আসছে তাই আমরাও করছি। আর এটা শুনেই মুসলমানরা প্ল্যান করে ফেলে হিন্দুদেরকে ব্রেইন ওয়াশ করে ধর্মান্তরিত করতে কোথায় কিভাবে হিট করতে হবে।
এই সরস্বতী পূজা এবং তার নানা অনুষঙ্গ নিয়ে আমার অন্য এক পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আজ যখন সুযোগ এসেই গেলো তখন লক্ষ্মীপূজার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো এই পোস্টে। দিদির প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি, দিদি প্রথমেই লিখেছে,
“লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ আর নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজানো যায়। আমি জানতে চাই দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে?”
লক্ষ্মী পূজায় যে ঘন্টা বাজানো নিষেধ, এই তথ্যটা সম্ভবত ম্যাক্সিমাম হিন্দুই জানে না। জানবে কিভাবে, যাদের উপর আমরা পূজার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছি, তাদের মূল কাজই তো হলো- নমো নমো ব’লে ফুল জল ছিটিয়ে চাল কলা আর দক্ষিণা নিয়ে বিদায় হওয়া। হিন্দুধর্মের তত্ত্ব হিন্দুদের শিখিয়ে তারা নিজেদের ভাত মারবে নাকি !
লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা বাজানোর সাথে সাথে লোহা বা স্টিলের কোনো কিছু ব্যবহার করাও নিষেধ। লোহা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে শাস্ত্রে বলা আছে, লোহা দিয়ে নাকি অলক্ষ্মীর পূজা হয়, তাই লোহা দিয়ে লক্ষ্মীর পূজা হয় না। পূজায় যে ঘন্টা বাজানো হয়, সেই ঘন্টাও এক ধরণের লৌহজাত পদার্থ খেকেই তৈরি, এই দৃষ্টিকোন থেকে লক্ষ্মীপূজায় ঘন্টা না ব্যবহারের একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এই বিশ্বাসটা পুরোটাই আধ্যাত্মিক, এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যতক্ষণ না কর্মে প্রকাশ পাচ্ছে, ততক্ষণ এটা কারো বাস্তব জীবনে কোনো দিন প্রভাব ফেলে না আর ফেলবেও না। তাহলে লক্ষ্মী পূজা্য় এই লোহা, স্টিলের জিনিসপত্র বা ঘন্টা বাজাতে না বলার বাস্তব কারণ আসলে কী ?
আমাদের মুনি-ঋষিরা তাদের ধ্যান অর্থাৎ গবেষণায় যে জ্ঞান লাভ করতেন, তা তারা সমাজের মানুষের জন্য ধর্মের মোড়কে প্রচার করতেন। কারণ, তাহলে মানুষ খুব সহজে সেগুলো বিশ্বাস করতো, সেই অনুযায়ী কাজ করতো এবং বাস্তবে তার ফল লাভ করতো। যেমন তুলসীগাছ এবং তার পাতার গুণাগুন নিয়ে আমাদের মুনি-ঋষিদের যে গবেষণা তা যদি আমি লিখি, সেটা ৫/৬ হাজার শব্দের একটা পোস্ট হবে এবং আপনাদের পড়তে কমবেশি ১ ঘন্টা সময় লাগবে। কিন্তু এত কথা কি সাধারণ মানুষকে গিয়ে জনে জনে বলা সম্ভব ? সেজন্য তারা সর্বসাধারণের জন্য শুধু বলেছেন,
“যারা প্রত্যহ তুলসীর দর্শন, স্পর্শন, ধ্যান, গুণ কীর্তন, প্রণাম, গুণশ্রবন, রোপন, জল প্রদান ও পূজা এই নয় প্রকারে তুলসীর ভজনা করেন তারা সহস্র কোটি যুগ পর্যন্ত বিষ্ণুলোকে বসতি লাভ করেন”।
এখন এই বিষ্ণুলোকে বসতি লাভ করার ব্যাপারটা তো আধ্যাত্মিক, মরার পর সেখানে আপনার জায়গা হোক বা না হোক, বিষ্ণুলোক থাক বা থাক, তুলশী গাছ সম্পর্কিত ঐ নির্দেশ মেনে চললে আপনার পার্থিব জীবন যে, রোগ-শোক মুক্ত সুন্দর হবে, সেটা তো নিশ্চিত। আমাদের মুনি-ঋষিদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো এটাই, পৃথিবীর মানুষকে ভালো রাখা। এই ভালো রাখার একটি বাস্তব থিয়োরি লুকিয়ে আছে লক্ষ্মী পূজায় ঘন্টা না বাজানোর মধ্যে।
মানুষের চরিত্রের একটা স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো ঈর্ষা। এই ঈর্ষা হলো মানুষের মনের চাপা অনুভূতি যেটা কথার মাধ্যমে নয়, প্রকাশ পায় মানুষের মুখণ্ডলের অভিব্যক্তির মাধ্যমে। একটা সূক্ষ্ম এবং কঠিন বাস্তব কথা হলো- শিক্ষক এবং পিতা মাতা ছাড়া আপনার উন্নতি প্রকৃতপক্ষে কেউ ই চায় না। আপনার ছোটবেলায়, আপনার যে ভাই আপনার ভালো রেজাল্টের জন্য আপনাকে রাত দিন পড়িয়েছে, আপনি যখন বড় হয়ে সেই ভাইকে শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞানে ছাড়িয়ে যেতে চাইবেন বা ছাড়িয়ে যাবেন, সেই ভাই তখন আপনাকে নিয়ে ঈর্ষায় ভুগবে। আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে ভাই আপনাকে টাকা পয়সা দিয়ে হেল্প করে লাইনে তুলে দেবে, সেই ভাই ই আপনাকে নিয়ে ঈর্ষায় ভুগবে যখন আপনি টাকা পয়সা, ধন সম্পদে তাকে ছাড়িয়ে যাবেন। ছোট বেলায় যে ভাইয়েরা একে অপরের জন্য জীবন দেয়, বড় হওয়ার পর সংসার ভাগ হয়ে গেলে সেই ভাইয়েরাই বাঁশ ঝাড়ের একটা বাঁশ কাটা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে নিজের পরিবারের মধ্যেই কোনো ভাই যখন প্রকৃত অর্থে মন থেকে চায় না আপনার উন্নতি, তখন আপনার প্রতিবেশি সেটা চাইবে কিভাবে ? ঘন্টা বাজিয়ে প্রতিবেশিকে জানান দিয়ে ধন-সম্পদের জন্য লক্ষ্মীপূজা করলে আপনার প্রতিবেশি কি আপনার প্রতি ঈর্ষায় ভুগবে না ? এটাই তো বাস্তব, যখনই আপনি উন্নতির জন্য চেষ্টা করেন তখনই আপনার আশে পাশের লোকজন আপনার প্রতি ঈর্ষায় ভুগে এবং আপনাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করে। আর যখন তারা জানবে, উন্নতির জন্য আপনি লক্ষ্মীর পূজা করছেন, তখন তারা কী ভাববে ?
অনেকে হয়তো ভাবছেন, প্রকাশ্যেই তো লক্ষ্মীপূজা করা হয়, এতে আবার গোপনীয়তার কী ? প্রকাশ্যে যেটা করা হয় সেটা পাড়ার মন্দিরে সার্বজনীন অর্থাৎ সবার জন্য, সেখানে ঈর্ষার কোনো ব্যাপার থাকে না। কিন্তু বাড়িতে ঘরের মধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজা করার বিধান শাস্ত্রে দেওয়া আছে এবং ঘরের মধ্যেই লক্ষ্মী পূজা করার বিধান যাতে ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা থাকে, এখানে আমি সেই সিচুয়েশানকে বেজ করেই কথা বলছি, শাস্ত্রের বিধানও তাই- ঘরেই লক্ষ্মী পূজা করা। আর এট তো কমনসেন্সের ব্যাপার যে, ঘরে লক্ষ্মীকে ধরে রাখার জন্য ঘরের ভেতরই তার পূজা করা উচিত, মাঠের মধ্যে তার পূজা করে লাভ কী ? মাঠের মধ্যে প্যান্ডেল খাটিয়ে যে লক্ষ্মী পূজা করা হয় সেটা জাস্ট অনুষ্ঠান মাত্র, ঘরের মঙ্গল তাতে কখনো হয় না আর হবেও না।
তাই প্রতিবেশিদের ঈর্ষা থেকে বেঁচে নিজেদের উন্নতি করতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মী পূজা করতে হবে গোপনে, এজন্যই লক্ষ্মীপূজায় ঘন্টা বাজানো নিষেধ; কারণ, ঘন্টার কাজই হলো কী ঘটছে তা সবাইকে জানার সুযোগ করে দেওয়া। আর একারণেই স্টিল বা লোহাজাত কোনো বাসন কোসন ব্যবহার করাও নিষেধ; কারণ এগুলো ধাতব পদার্থ বলে ব্যবহারের সময় ঠোকাঠুকি লেগে শব্দ হতে পারে, যা গোপনীয়তা নষ্ট করতে পারে। অন্য কোনো পূজার সাথে মানুষের ঈর্ষার কোনো প্র্যাকটিক্যাল যোগাযোগ না থাকায়, অন্যান্য সব পূজাতে ঘন্টা বাজানো যায়, এর মূল কারণ প্রতিবেশিদেরকে সেই বিষয়টি জানানো, যাতে সবাই সেই পূজায় অংশগ্রহনের মাধ্যমে নিজেদের মঙ্গল ও কল্যান কামনা করতে পারে।
এরপর দিদির প্রশ্ন হচ্ছে,
“দুইটা পূজা এক রুমেই তো আমরা করি, তাহলে কিভাবে পূজা করতে হবে?”
ব্যাপারটা সিম্পল, আপনার ঘরে নিশ্চয় টিভি আছে। তো আপনি কি একই সময় দুইটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখতে পান ? নিশ্চয় নয়। একটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা বন্ধ করেই আপনাকে অন্য আর একটা চ্যানেলে যেতে হয়। প্রকৃতপক্ষে একটা মানুষ কখনোই দুটো কাজ এক সাথে করতে পারে না। তাকে যেকোনো একটা কাজ বন্ধ রেখে অন্য আর একটা কাজ করতে হয়। তাই আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যদি বিধিসম্মতভাবে লক্ষ্মীপূজা করেন ঠিক একই সময়ে নারায়ণের পূজা করেন না। যেমন একই সময় টিভিতে আপনি দুইটা চ্যানেল দেখতে পারেন না। আপনি যদি একই ফুল দিয়ে দুই দেবতাকে সন্তুষ্ট করার নিয়ম চালু করে থাকেন, সেটা অন্য ব্যাপার; কারণ, একই কথা বলে আপনি কখনো দুই জনকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, যদি আপনি তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে চান- যাকে যা বললে সন্তুষ্ট হবে, তাকে আপনাকে তাই বলতে হবে। তাই আপনাকে একটা পূজা শেষ করে অন্য আর একটা পূজা করতে হবে, এটাই সমাধান আর এটাই বাস্তবসম্মত।
মূর্তি যেহেতু একই মন্দিরে স্থাপিত সেহেতু আপনার মনে হতে পারে, নারায়ণ পূজায় ঘন্টা বাজালে লক্ষ্মী তো শুনে ফেলবেই, তাহলে লাভ কী হলো ? পূজার ঘন্টা কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে বাজানো হয় না, হয় প্রতিবেশি বা আশে-পাশের লোকজনকে সেই পূজার বিষয়টি জানানোর জন্য; লক্ষ্মীপূজায় কেনো ঘন্টা বাজানো নিষেধ, তার বাস্তব কারণ উপরে আলোচনা করেছি, আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছেন। তাই ঘন্টা বাজানো নিয়ে এত দ্বিধায় ভোগার কোনো কারণ নেই। আপনি যদি আলাদা করে শুধু লক্ষ্মীপূজা করেন সেক্ষেত্রেই কেবল ঘন্টা বাজানো নিষেধ, যাতে আপনার প্রতি প্রতিবেশিদের ঈর্ষার সৃষ্টি না হয়।
আর জেনে রাখুন, লক্ষ্মী আলাদা কোনো দেবী সত্ত্বা নয়, লক্ষ্মী নারায়ণ বা বিষ্ণুরই নারী শক্তি, যাকে আমরা স্থূল দৃষ্টিতে নারায়ণ বা বিষ্ণুর স্ত্রী বলে থাকি। একইভাবে ব্রহ্মার নারী শক্তি সরস্বতী এবং মহেশ্বরের নারী শক্তি দুর্গা বা কালী। সংসারে নারীর গুরুত্ব বোঝাতে তিনটি প্রধান দেবতার সাথে তাদের নারী শক্তির কল্পনা করা হয়েছে। ব্রহ্মার কাজ সৃষ্টি করা, সৃষ্টি করতে লাগে জ্ঞান, এজন্য ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম সরস্বতী; শিবের কাজ ধ্বংস করা, এজন্য শিবের নারী শক্তি অসুর বিনাশী দুর্গা বা কালী; আর বিষ্ণুকে কল্পনা করা হয়েছে পালনকর্তা হিসেবে; পালন করতে লাগে ধন সম্পদ, এজন্য বিষ্ণুর নারী শক্তির প্রতীক হলো ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী। লক্ষ্মী যেমন আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, লক্ষ্মী ও বিষ্ণু এক, তেমনি বিষ্ণুও কোনো আলাদা সত্ত্বা নয়; বিষ্ণু, সৃষ্টিকর্তা পরমব্রহ্মেরই একটি রূপ, যার মাধ্যমে পরমব্রহ্ম তার সৃষ্টিকে পালন করে থাকে। সুতরাং লক্ষ্মী পুজা বা নারায়ণের পূজা বা যে দেবতারই পূজা করেন না কেনো, তা শেষ পর্যন্ত সেই পরম ব্রহ্মেরই পূজা এবং সকল পূজা তার কাছে গিয়েই পৌঁছা্য়, যেমন সকল নদীর জল সমুদ্রেই গিয়ে পড়ে।
আমার ধারণা দিদি তার সকল প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি শিরোনামেই জানিয়ে দিয়েছিলাম এই পোস্টে লক্ষ্মী পূজা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো, এখন শুরু করছি সেই আলোচনা :
লক্ষ্মীর কাঠামোতে বা লক্ষ্মীর ছবিতে পেঁচার সাথে সাথে আর যা কিছু থাকে, যেমন- কুলা, ধান সিঁদুরের কৌটাসহ সবকিছুই একটি সাজানো সুন্দর সংসারের প্রতীক, যাকে এককথায় বলে লক্ষ্মীর সংসার। এর মধ্যে ধান হলো ধনের প্রতীক। যাদের জমি-জমা আছে তাদের অবশ্যই ধান চাষ করা উচিত, এতে ধনের দেবী লক্ষ্মী, ঘরে বাঁধা থাকে ও সন্তুষ্ট থাকে। চাল কিনে খাওয়া দারিদ্রতার প্রতীক। যাদের চাষের জমি নেই, তারা চাল কিনে খেতে পারে, কিন্তু তারাও যদি ধান কিনে সেই ধান সিদ্ধ করে চাল বানিয়ে খায় তা মঙ্গলজনক; কারণ এতেও ধনের প্রতীক ধানের আগমন ঘটে বাড়িতে; আর এভাবে কুলার ব্যবহার কিছুটা হয়, কিন্তু সরাসরি চাল কিনে খেলে কুলার ব্যবহার তেমন হয় ই না, যার ফলে লক্ষ্মীর সংসার বলতে যা বোঝায় তা অপূর্ণই থাকে।
এখানে আর একটা বিষয় বলে রাখি, যেসব হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠানে কাউকে আশীর্বাদ করা হয়, খেয়াল করে দেখবেন, তাকে ধান দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। এর কারণ হলো- পূর্বেই বলেছি, ধান ধনের প্রতীক, তাই ধান মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করার মানে হলো- আমি প্রার্থনা বা কামনা করি তুমি ধনবতী বা ধনবান হও। আর দুর্বা হলো অমরত্বের প্রতীক। যেকোনো মাটিতেই দুর্বা জন্মে বা জন্মাতে পারে, এমন কি ১০০ বছর পরও যদি একবার কোনো নদী শুকিয়ে যায়, সেই নদীর তলাতেও দুর্বা ঘাস জন্মে থাকে। এভাবে দুর্বা অমর, কারণ তার কোনো মরণ নেই। ধানের সাথে দুর্বা দিয়ে এই প্রার্থনা বা কামনা করা হয় যে তুমি ধনবতী বা ধনবান হওয়ার সাথে সাথে অমরও হও।
লক্ষ্মীর সাথে আর যা পূজিত হয়, সেটা হলো পেঁচা। পেঁচা কয়েক প্রকারের থাকলেও লক্ষ্মীর সাথে থাকে বলে এক জাতের পেঁচার নামই লক্ষ্মী পেঁচা। এই পেঁচা হলো নিশাচর প্রাণী, এর মানে হলো পেঁচা দিনের বেলা বের হয় না, তাই পেঁচাকে সাধারণত দিনের বেলা দেখা যায় না, পেঁচা তার বাসা থেকে বের হয় রাতে, শিকার করেও রাতে। এভাবে পেঁচা একটা গোপন জাতের প্রাণী বা অন্যভাবে বলা যায় পেঁচা হলো গোপনীয়তার প্রতীক। তাহলে লক্ষ্মীর সাথে পেঁচার সম্পর্কটা কী ?
ধনার্জনের জন্য লক্ষ্মীর পূজা করতে হবে যেমন গোপনে, তেমনি লক্ষ্মীর সাথে পেঁচা থাকার মানে হলো অর্জিত সেই ধনসম্পদ রাখতেও হবে গোপনে। কারণ সম্পদের প্রকাশ পেলেই শত্রু বাড়ে, আর শত্রু বাড়লেই যে বিপদ সেটা তো সবাই বোঝেন। এজন্যই প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছে- অর্থই অনর্থের মূল। কারণ, অর্থ উপার্জনের পর সেই অর্থকে যদি আপনি ঠিক মতো ব্যবহার করতে না পারেন, তা আপনার বা আপনার পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে আনবেই আনবে।
পেঁচার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, পেঁচা রাতের বেলা কঠিন অন্ধকারকে ভেদ করেও দেখতে পায়। এখানে অন্ধকার হলো বিপদ-আপদের প্রতীক। আপনার যদি পর্যাপ্ত ধন-সম্পদ থাকে, আপনার সামনে যতই বিপদ-আপদ আসুক না কেনো, আপনি একটা রাস্তা খুঁজে পাবেনই। লক্ষ্মীর সাথে পেঁচা অবস্থান করে আমাদেরকে আসলে এই কথাগুলোই বলে। এভাবে লক্ষ্মীর সাথে যা যা থাকে বা আমরা যেসবের পূজা করি, সবই কিছুই, কিছু না কিছুর প্রতীক, আর সেই প্রত্যেকটা প্রতীক আমাদেরকে কিছু না কিছু তথ্য দেয়।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হিন্দু ছাড়া আর কেউ তো লক্ষ্মীপূজা করে না, তাহলে তারা কি ধন সম্পদ অর্জন করে না বা তাদের মধ্যে কি কেউ ধনী নেই ? সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো- বিলগেটস কি লক্ষ্মীপূজা করে ? তাহলে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী হলো কিভাবে ?
শুধু লক্ষ্মী পূজাই নয়, সমস্ত পূজাই প্রতীকী পূজা। এই প্রতীকগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য গল্প। এই প্রতীকগুলো আমাদেরকে কিছু বলে, আমাদেরকে কিছু তথ্য দেয়, যেকথাটা একটু আগেই বলেছি।
বাংলাদেশে, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, ১৬ ডিসেম্বর এবং ২৬ মার্চেও জাতীয় স্মৃতিসৌধেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়, ভারতসহ অনেক দেশেই এমনটা করা হয়, এটা আসলে একপ্রকার পূজা। কিন্তু এই ফুল পেয়ে, যারা মরে গেছে, তাদের কি কোনো উপকার হয় ? এক কথায়, না। তারপরেও কেনো আমরা প্রতিবছর ঐসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করি ?
আসলে এই সব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু তথ্য নতুন প্রজন্মের স্মৃতিতে ট্রান্সফার করা হয়, আর তাদের মধ্যে সেই সকল ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা হয়, যারা দেশ ও জাতির জন্য কিছু করেছে ? এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ একটি পরম্পরা তৈরি করে, যা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। কারণ, এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ মানুষের মস্তিষ্ক্যে এমন একটি প্রভাব ফেলে যা তাকে ঐ পরম্পরাটি বয়ে নিয়ে যেতে সাহা্য্য করে।
আমরা শ্রদ্ধাভরে যখন কোনো দেব-দেবীর পূজা করি, তখন আমাদের ব্রেইন এর মধ্যে ঠিক এমনই একটি প্রভাব কাজ করে, যে প্রভাবটি ঐ পূজা ব্যতীত কিছুতেই সৃষ্টি হতো না। ব্রেইন এর মধ্যে এই যে প্রভাব, সেটি আসলে কিভাবে আমাদেরকে সাহা্য্য করে ?
কোয়ান্টাম মেথডের সূত্রানূসারে যখন আমরা কোনো কিছু মনে প্রাণে চাই এবং বার বার চাই, তখন ব্রেইন সেটা আমাদেরকে পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে সেভাবে পরিচালিত করা শুরু করে, এভাবে ব্রেইন অবচেতনভাবে কাজ করেই আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কাছে পৌঁছে দেয়। এজন্যই আমরা যেটা বার বার ভাবি বা করতে চাই, খুব অসম্ভব কিছু না হলে সেটা আমরা পেয়েই যাই । আমাদের সকল পূজা প্রতীকী হলেও, পূজার মাধ্যমে আমাদের ঐকান্তিক চাওয়া, আমাদের ব্রেইন আসলে সেভাবেই পূরণ করে দেয়। কারণ, দেবতার কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা মূলত আমাদের মস্তিষ্ক্যে সেই বিষয়টি লোড করে দিই বা , মস্তিষ্ক্যকে সেই নির্দেশনা দিই, আর আমাদের মস্তিষ্ক্য আমাদেরকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করতে থাকে এবং এভাবেই আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাই।
এটা শুধু হিন্দুদের পূজা প্রার্থনার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো ধর্মের লোক তাদের সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলেও তার ব্রেইন এর মাধ্যমে সে একই ফল পায় বা পাবে। তো যে ছেলে বা মেয়েটা সরস্বতীর কাছে সরল বিশ্বাসে এই প্রার্থনা করছে যে, আমাকে জ্ঞান দাও, বুদ্ধি দাও; এই চাওয়ার ফলে সরস্বতীর উছিলায় তার ব্রেইন তাকে এমনভাবে পরিচালিত করছে, যার ফলে তার বাড়তি কিছু জ্ঞান বুদ্ধি লাভ হবেই। কারণ, যে বিদ্যালাভের জন্য প্রার্থনা করবে, সে বই নিয়ে দু চারদিন বেশি বা দুই চার ঘন্টা বেশি পড়বেই, সরস্বতীর উছিলায় কাজ হয় বা হবে এভাবেই; একইভাবে যে লোক, ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করছে, লক্ষ্মীর উছিলায় তার ব্রেইনও সেই লোককে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়াচ্ছে যাতে তার ভালো রোজগার হতে বাধ্য। কোনো অলৌকিক দেব-দেবী বা কোনো অলৌকিক সৃষ্টিকর্তা আসলে কারো জন্য কিছু করতে পারে না বা কাউকে কিছু দিতে পারে না। মানুষ তাদের বিশ্বাসের দেব-দেবী বা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে মূলত তাদের নিজেদের ব্রেইনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় বা তাদের চিন্তার ফলই তাদেরকে ফল দেয়।
পৃথিবীর সবাই চায় ধন-সম্পদ এবং এর জন্য তারা তাদের নিজ নিজ যোগ্যতার পাশাপাশি কামনা করে বেশি বেশি সম্পদ, কোনো অলৌকিক সত্ত্বার কাছে প্রার্থনা না করলেও তাদের মনের এই কামনাই তাদেরকে পৌঁছে দেয় তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, আর এভাবেই লক্ষ্মীপূজা না করেও যে যার মতো পায় ধন সম্পদ।
এখন বিজ্ঞানের এইসব নিগূঢ় তথ্য সবার পক্ষে জানা সম্ভব হয় না আর সাধারণ সব লোকের পক্ষে এটা বোঝাও সম্ভব নয়। যারা এই বিজ্ঞান জানে বা বোঝে, তারা লক্ষ্মী সরস্বতীর পূজা না করেও নিজেদের ব্রেইনকে কমান্ড করে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে বিজ্ঞানের এই জ্ঞান পৌঁছে নি বা যাদের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়, তারা সরল বিশ্বাসে জ্ঞান বুদ্ধির জন্য যদি সরস্বতীর কাছে এবং ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করে, একই ফল লাভ করবে। তবে এখানে একটা বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য যে, যে কোনো দেব-দেবীর কাছে পূজার নামে প্রার্থনা করতে হবে আপনার নিজেকে এবং এ্ই প্রার্থনা করতে হবে অবশ্যই মাতৃভাষায়। পুরোহিতকে দিয়ে যদি বাড়িতে পূজা করিয়ে নেন, আর আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি সেই দেব-দেবীর কাছে কোনো প্রার্থনা না করেন, তাহলে সেই পূজা পুরোটাই বেকার, শুধুই অর্থ খরচ। এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, যেকোনো পূজার জন্য আমরা যতসব আয়োজন করি, সেটা ঐ পূজাটাকে একটা অনুষ্ঠানে রূপ দিতে সাহা্য্য করে মাত্র; ফুল জল বেল পাতা ঐ দেব-দেবীর প্রতি আত্মসমর্পনের একটা প্রসেস; কারণ, একমাত্র আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিই পারে অহংকারমুক্ত হয়ে প্রকৃত অর্থে প্রার্থনা বা কামনা জানাতে। এ কারণে আমরা যদি কোনো পূজার আয়োজন না করেও শুধু দেব-দেবীর মূর্তি বা তাদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে প্রতিদিন প্রার্থনা করি, পূজার মতো একই ফল লাভ হবে, যে পদ্ধতিতে প্রার্থনা করে- ইসলাম, খ্রিষ্ট এবং ইহুদি মতাবলম্বীরা।
লক্ষ্মীপূজা সম্পর্কে শেষ প্রশ্ন হতে পারে, কোজাগরী মানে কী বা এটাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা কেনো বলা হয় ?
শরৎকালে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার রাত্রি বৎসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত্রি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতে ধনসম্পদ, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন; সেই রাতে যে বা যারা লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকে দেবী তার কাছ থেকে সাড়া পান এবং তার গৃহে প্রবেশ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন। কোজাগর আক্ষরিক অর্থ “কে জেগে আছ ?” এর থেকে এসেছে কোজগরী শব্দটি। এজন্য আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথির অন্য নাম হয়ে গেছে কোজাগরী পূর্ণিমা এবং ঐ তিথিতে অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপূজাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা বলে অভিহিত করা হয়।
সংগৃহীত



No comments:
Post a Comment