জনপ্রিয় ট্যাগস

Tuesday, October 3, 2017

শক্তিসাধনার একই ডাকাতিয়া সুর বেজে চলেছে সমাজের সর্বত্র। সনাতন ধর্ম কথা, Sanatan Dharma Katha


ডাকাত যদি হয় রবিনহুডীয় বা আমাদের বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানির মতো, তখন মনে হতেও পারে, ডাকাতি সবসময় দোষের নয়। সারা বাংলায় ও আশপাশে এমন ডাকাতে কালীর মন্দির প্রচুর। এক শতাব্দী আগেও তার কোথাও কোথাও নরবলি হতো। শাক্ত উপাসক বেশ কয়েকটি মন্দিরে আজও বলি বন্ধ করা যায়নি। ডাকাতি যেহেতু অত্যন্ত উগ্রপন্থা, সেহেতু মহাকালীর ভীষণা মূর্তির আরাধনাই ডাকাতিয়া মানসের অবলম্বন হয়ে উঠেছিল। শোনা যায়, সেইসব মহান ডাকাত আগে থাকতে খবর দিয়ে ডাকাতি করতে আসত ! কী বুকের পাটা ! আর কী অকপাট্য ! 
সূর্যের আলো ভালমন্দ দু’য়েই গিয়ে পড়ে। আলোর কি কোনও বাছবিচার আছে? যে কোনও শক্তিই নৈর্ব্যক্তিক। ওই যে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ নাটকে জমিদারগিন্নি কালীর পদতলে মাথা ঠুকে বলছে, ‘বুড়োটাকে নাও, মা ! বাগানটা দাও, মা !’ উদোম নির্লজ্জ বাসনার কুত্‌সিত প্রকাশসমেত কালীর পূজা, মন্দিরে মন্দিরে, ম্যারাপে, ব্যক্তিগত ঠাকুরঘরে আজও সমানভাবে দৃষ্ট। গত দেড়শো বছরে ডাকাতির পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু ‘দাও মা, দাও মা’ বলে কেঁদেকেটে কোটি টাকা ব্যয়ে কালীর পূজা চলছেই। আগে কেবল ঢাকবাদ্যি বাজত। এখন শব্দবাজির দৌরাত্ম্যে, চাঁদার জুলুমে, পথ আটকে ম্যারাপ বাঁধার অত্যাচারে শক্তির পূজা পেষণ-ক্ষমতার উদাহরণও বটে।
তবে, আজি হতে শতবর্ষ আগে, যখন সমাজ মূলত ছিল গ্রামভিত্তিক, যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ চালের কাঁকরের মতো জীবনে অনিবার্য সেঁধোয়নি, তখন মিথ হয়ে যাওয়া ডাকাতেরা চমত্‌কার সমাজদর্শনের প্রমাণ রেখেছিল। জমিদার বা ধনিকশ্রেণি ন্যায়ের মুখোশ পরে গরিব প্রজার সর্বস্ব হরণ করত। ডাকাতেরা ন্যায়-অন্যায়ের পরোয়া না-করে ধনীগৃহ লুট করত। সামাজিক সম্পদের বণ্টনে সামঞ্জস্য না-থাকলে যা হয়। 
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিষেবা, রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা— কোনওটিই এখন ডাকাতির বাইরে নয়। বহু নীতি, বহু নেতা। বহু প্রণয়ন, বহু প্রণেতা। লুটমারের বিষচক্র যেন শক্তির বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞাকে সপ্রমাণ করে বেঁচে থাকতে চাইছে। অশুভ হোক, শুভ হোক, শক্তি অবিনশ্বর। ডাকাতেরা প্রবল জ্ঞানী বা প্রকৃত সাধক ছিল না। দু’একজন ব্যতিক্রম। বাকিদের শক্তিসাধনা উগ্রতার কাছে উগ্রের নিবেদন। অথচ শাস্ত্রমতে শিব ও শক্তির ব্যাখ্যা গভীর দর্শন। শিববক্ষে কালী  অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্যের উপর পরিবর্তনশীল জগত্‌প্রসবিনী মায়ার খেলা!
শক্তির উপাসনায় যে বলি দেওয়ার প্রথা, কালক্রমে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাসনা চরিতার্থে দৈবশক্তিকে পারিতোষিক দেওয়া। ডাকাতেরাও এই ভাবনা থেকেই রক্ত দিয়ে দেবীকে খুশি করতে চাইত। অথচ, বলির অর্থ নিয়ন্ত্রণহীন চিত্তবৃত্তির ত্যাগ। ধর্মের ছাপ থাক বা না-থাক, ঈশ্বরে বিশ্বাস থাক বা না-থাক, এই চিত্তবৃত্তিই মানুষের ইতিহাস রচনা করে। কালী মঙ্গলময়ী এবং ভীষণা। কালী শুভাশুভের সমাহার। কিন্তু শ্যামাপূজার ধুমধাম উত্‌সবে প্রতি বছরের মতো এবারও শব্দবাজির দৌরাত্ম্য অসুস্থকে অারও পীড়িত করবে, কিছু পতঙ্গ ধ্বংস হবে, পথের ধারে ধারে পচে উঠবে খিচুড়ি প্রসাদের এঁটো কলাপাতা, লাউড স্পিকারে গান বাজবে তো বাজবেই! উত্‌সবের রাজ্যে মায়ের পূজা বলে কথা!
Print Friendly and PDF

No comments:

Post a Comment